Bangladeshi Marine Community, Singapore

Bangladeshi Marine Community, Singapore

বাংলার সমৃদ্ধি

এ কে এম সাইফুল্লাহ

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। জাহাজে মিসাইল হামলা, একজন তরুণ নৌ-প্রকৌশলীর মৃত্যু, ২৮ জন নাবিকের অনিশ্চিত জীবনযুদ্ধের এক রোমহর্ষক আখ্যান ০২ মার্চ ২০২২ তারিখে নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো জাতিকে। এ লেখায়, সংশ্লিষ্ট নানান নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী মূল ঘটনাকে বিবৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্কতা ছিলো, তারপরেও হয়তো কিছু তথ্য বিভ্রাট কোথাও থেকে যেতে পারে। বাস্তবতার নিরিখে মূল ঘটনাকে ফুটিয়ে তুলতে জাহাজে বহুল প্রচলিত বিভিন্ন বিদেশি পরিভাষা (jargon) ব্যবহার করতে হয়েছে। পাঠকের ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তুরষ্কের এরেগলি থেকে ইউক্রেন যাচ্ছি শুনেই মা বলেছিলেন, “তোমরা ওখানে কেন যাচ্ছ? অবস্থাতো ভাল না”। ওখানে যে উত্তেজনা আছে, এটা আমরাও জানতাম। P&I Club এর সূত্র থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী বি এস সি এবং চার্টারারদের (charterer) জাহাজ থেকে জানানো হয়েছিল যে, ‘ইউক্রেনকে যুদ্ধ ঝুঁকি অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে’। জবাবে বি এস সি থেকে জানানো হয় যে, জাহাজের যুদ্ধ ঝুঁকি বীমার (war risk insurance) প্রিমিয়াম বাবদ অতিরিক্ত খরচের টাকা চার্টারাররা দিবে। সুতরাং, ইউক্রেনে যেতে কোন সমস্যা নেই। যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ কোন তথ্য জাহাজে ছিল না। যুদ্ধাঞ্চলে (war zone) যাবার আগে নাবিকদের কাছ থেকে বিশেষ কোন অনুমতিও নেয়া হয়নি। প্রায় সবাই এই ব্যাপারটাকে হালকাভাবেই নিয়েছিল।

জাহাজে ক্যাপ্টেন এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ার দু’জনেরই রিলিভার চলে এসেছেন। তারা চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে সাইন অন (sign on) করেছিলেন ২০২১ সালের মার্চ মাসে। সে হিসেবে সাড়ে এগার মাস সি-সার্ভিস (sea service) হয়ে গেছে এই জাহাজে। কথা ছিল ইউক্রেনে সিরামিক ক্লে বোঝাই করে ফেরার পথে ইস্তানবুল থেকে ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং দু’জন ফিমেল ক্যাডেট সাইন অফ (sign off) করবেন।

আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের বহির্নোঙ্গরে এসে পৌঁছাই। ঐ সময় সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। রাশিয়ান নেভির নির্দেশনা অনুযায়ী ফায়ারিং জোনের (firing zone) আওতার বাইরে থাকার জন্য প্যাসেজ প্ল্যান (passage plan) পরিবর্তন করা হয়েছিল। আরো ৫/৬টা জাহাজের সাথে একটা কনভয়ে আমরা প্রায় ৬৮ নটিক্যাল মাইল ম্যানুভারিং (manoeuvring) করে ২৩ তারিখ রাত ন’টার দিকে অলভিয়া বন্দরে নোঙর করি।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি। ঐদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাহাজের অনতিদূরে ৭০০-৮০০ মিটারের মধ্যে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা হয়। পুরো জাহাজ কেঁপে ওঠে। ক্যাপ্টেন ব্রিজে ফোন করে জানতে চান “কি হয়েছে”? ডিউটি অফিসার বিভ্রান্ত স্বরে ক্যাপ্টেনকে জানায় যে, “স্যার, মনে হচ্ছে বোমাবর্ষণ হয়েছে”। তখন বাম দিকে অনেক বড় একটা মাশরুম ক্লাউড (mushroom cloud) দেখা যায়। ক্যাপ্টেন সাথে সাথেই ব্রিজে এসে বাইনোকুলার দিয়ে পোর্টসহ আশপাশের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন। দশটার দিকে স্থানীয় এজেন্ট ফোন করে জানায় যে যুদ্ধ লেগে গেছে। অতি সাধারণ আমাদের অকল্পনীয় যুদ্ধাবস্থার সাথে এই প্রথম পরিচয়।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত অলভিয়া থেকে বের হবার জন্য জাহাজের মেইন ইঞ্জিন প্রস্তুত  করা হয়। পাইলটসহ অথবা পাইলট ছাড়া অলভিয়া বন্দর থেকে জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে যাবার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু, স্থানীয় বন্দর থেকে অনুমতি মেলেনি। হার্বার মাস্টারকে অনেকবার ফোন করা হয় পোর্ট থেকে বের হবার অনুমতি নেবার জন্য। তিনি আমাদের ফোন ধরেননি। একসময় এজেন্টও আমাদের ফোন নেয়া বন্ধ করে দেয়। ঐ সময় জাহাজে একটা বার্তা (message) আসে। যেখানে জানানো হয় আমাদের বের হবার পুরো চ্যানেল জুড়ে মাইন স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের সামনেই একটা তুর্কির জাহাজ ছিল। ওরাও অনেক চেষ্টা করছিল পোর্টের সাথে যোগাযোগ করার জন্য। কিন্তু সফল হয়নি।

এর মধ্যে অফিসের সাথে যোগাযোগ করলে আমাদের এই বলে অভয় দেয়া হয় যে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী জাহাজে ওরা কোন ঝামেলা করবে না। অথচ চারদিকে তখন দূরপাল্লার বোম্বিং (bombing) হচ্ছিল। জাহাজ জুড়ে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে এসব দেখে আমাদের পরিস্থিতি তখন উদ্বেগ ও আশঙ্কার।

ভয় ও আতঙ্কে ২৫ তারিখ পার হয়ে যায়।  সম্ভাব্য বিমান হামলার এলাকার (air strike zone) মধ্যে থাকার কারণে আশেপাশের এলাকায় প্রায়ই সাইরেন বাজত। তখনো আমরা বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিৎ। এ অবস্থায় ডেকে সব ধরনের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। ভেতরে থাকতে বলা হয় সবাইকে ।

আমরা বুঝতে শুরু করি যে এখানে হয়ত দীর্ঘদিন থাকতে হতে পারে। তারই প্রস্তুতিস্বরূপ পানি, খাবার, জ্বালানী তেলসহ সবকিছুর ব্যবহার সীমিত করে দেয়া হয়। সে সময় দু’টি ট্যাংকে আমাদের প্রায় দেড়শ টন খাবার পানি ছিল। সব খাবার পানি একটা ট্যাংকে সরিয়ে ফেলা হয়। এর ফলে খালি হয়ে যাওয়া অন্য ট্যাংকটিতে নদীর পানি নেয়া হয়। যা দিয়ে আমরা খাবার ছাড়া অন্যান্য কাজ করতাম। ভারত থেকে প্রচুর বাসমতি চাল নেয়া হয়েছিল। তুরষ্কের এরেগলি থেকেও কেনা হয়েছিল খাবার। প্রায় দুই মাসের খাবারের মজুদ ছিল আমাদের। তারপরও অবস্থার বিচারে চিফ কুককে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় খাবার রান্না করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। ডিজেল ছিল ১১০/১২০ টনের মতন। ফুয়েল ছিল ১৫০ টন। অপ্রয়োজনীয় হিটিং ইত্যাদি বন্ধ করে দিয়ে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ৩.২ টন থেকে ১.৮ টনে নামিয়ে ফেলা হয়। জরুরী পরিস্থিতির জন্য একটা জেনারেটরের ফুয়েল লাইন ফ্ল্যাশ করে ডিজেলে চালাবার উপযোগী করে রাখা হয়। ডেকে একটা হেলিপ্যাড ছিল। সেটাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। শত্রুপক্ষের কোন হেলিকপ্টার যেন এটা দেখতে না পায়।

রাতের বেলায় তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে চলে যেত। এসি বন্ধ থাকত। রুম হিটিং অবশ্য চলত। আজান দিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হত। রাতের বেলা নদীর পাড় সংলগ্ন জনবসতির সব আলো বন্ধ হয়ে যেত। ঘুটঘুটে আঁধারে মাঝেমধ্যে দিগন্তে শুধু দেখা যেত সাইরেনের আলো।

ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখে আমাদের জাহাজের পাশেই বিমান হামলা হয়। দেশের সকল মিডিয়ায় জাহাজ থেকে আমাদেরকে নামিয়ে নেবার ব্যাপারে ততক্ষণে জোর প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। দূরে বোমা পড়লেও জাহাজ কেঁপে উঠত। সেখানে আমাদের কাছেই ইউক্রেনের একটা তথ্য যোগাযোগের ঘাঁটি (communication base) ছিল। যেখানে রাডার (Radar) ছিল। ওটা লক্ষ্য করে নিয়মিত বোমা হামলা হত। রাতের বেলা বোমার শব্দ শোনা যেত বেশি।

এরই মধ্যে আমাদের এক সহকর্মী ভুল করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলে যে জাহাজে মাত্র ৭ দিনের খাবার মজুদ আছে। এই ভুল তথ্যটা তখন ভাইরাল হয়ে যায়। যদিও ও বুঝতে পারে যে এটা ঠিক ছিল না। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ওকে অনেক তিরষ্কার করা হয়, সেই সাথে জাহাজের নাবিকদের উপর চাপ বাড়ে ভিতরের তথ্য বাইরে প্রকাশ না করার ব্যাপারে।

২৭ তারিখের পর রাতের বেলা ডেকের সব আলো বন্ধ করে দেয়া হয়। কেবিনের জানালার (porthole) পর্দা এমনভাবে টেনে দেয়া হত যেন বাইরে আলো না যায়। স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আশেপাশের অন্যান্য জাহাজের সাথে আমরাও AIS (Automatic Identification System) বন্ধ করে দেই। 

২৮ তারিখে খবর আসে যে আকাশপথে আমাদের উপর আক্রমণ করা হতে পারে। স্থানীয় খবরের উপর ভিত্তি করে সেকেন্ড অফিসার জাহাজে PA (Public Announcement) সিস্টেমে সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরে ‘এ ডেক’ (A Deck) এ Cargo Control Room এর সামনে জমায়েত হতে বলে। ঝুঁকি এড়াতে মাস্টার স্টেশনের (muster station) বদলে সেখানে যায় সবাই। সেদিন আমাদের উপর না হলেও আমাদের পাশেই বোমাবর্ষণ করা হয়। কাছেই বাংলাদেশের একটা বেসরকারি কোম্পানির বাংকার ছিল। ওখান থেকে বলা হয়েছিল নিরাপত্তার জন্য আমরা যেন ওদের বাংকারে চলে যাই। পোর্ট থেকেও বলা হয় যে, “তোমরা জাহাজ ছেড়ে চলে যাও”।

অথচ অফিস থেকে এ সময় আমাদের বলা হল জাহাজের নাবিকদের মিডিয়া উপযোগী একটা হাসিখুশি ছবি লাগবে! অগত্যা সে অনুযায়ী আমরা সবাই ব্রিজ উইঙে (bridge wing) যেয়ে ছবি তুলি। এটা বোঝাতে যে সবাই ভালো আছি। সেইদিন, ঐ সময়ে যদি মিসাইল মারা হত তাহলে আমরা হয়ত কেউই থাকতাম না।

মার্চ মাসের ১ তারিখে আতঙ্কে সবার চেহারা বদলে যায়। সেদিন বন্দর থেকে একটু দূরের শহর মাইকোলেভে বিরতিহীনভাবে বোমাবর্ষণ হচ্ছিল। আমরা তার ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই সবাই আরো ভীত হয়ে পড়ে। যদিও করার কিছু ছিল না। প্রবল বাতাসের সাথে তুষারপাত হয়েছিল সেদিন। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। সে কি ভয়ংকর দুঃসময়! সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছিলাম সবাই।

আমরা যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি কোম্পানির Sim4Crew ব্যবহার করতাম যোগাযোগের জন্য। ১ জিবি ডেটা কিনতাম ১০ ডলার দিয়ে। জাহাজে ৬/৭ টা Sim4Crew ছিল। ‘রবি’ সিমে ইউক্রেনের নেটওয়ার্কে হোয়াটসএ্যাপ মেসেজ ছিল ফ্রি। সিগনাল ভালো থাকায় বিকেলের দিকে ব্রিজে যেয়ে ইন্টারনেট হটস্পট ব্যবহার করে কেউ কেউ পরিবারের সাথে কথা বলত। সেই সময়ের বাস্তবতায় প্রিয়জনের সাথে এই যোগাযোগটুকুই ছিল সবার একমাত্র বিনোদন।

এ সময় ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়মিতই ফোন আসত বি এস সি থেকে, মন্ত্রণালয় থেকে। সবাই আমাদের খোঁজ নিচ্ছিলেন। দেশ থেকে দায়িত্বশীল কেউ কেউ আমাদের বলেছিল, “দুঃখিত, আমরা তোমাদের বের করে আনার কোন উপায় দেখছি না”। আবার এমনও বলা হচ্ছিল যে “দেখো, বাংলাদেশি জাহাজে কিছু হবে না”। অন্যদিকে তখন অনেকের বাড়িতেই আমাদের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে মহান করুণাময়ের কাছে জানের সদকা দেয়া হচ্ছিল। আত্মীয়-বন্ধু, পরিজনদের সাথে সাথে সারা দেশের মানুষ আমাদের নিরাপত্তার জন্য দোয়া করছিল।

জাহাজ থেকে নেমে যাবার ব্যাপারে অনেক আলোচনায় একটা প্রশ্নই বড় হয়ে ওঠে যে, এই প্রক্রিয়ায় কারো যদি কোনরকম ক্ষতি হয় তাহলে সে দায়িত্ব নেবে কে? সেই দুঃসময়ে পোল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমাদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রদূত যে এত ভালো হতে পারে, এটা আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি। উনি আমাদের বার বার বলছিলেন কিভাবে কি করতে হবে। কিন্তু, কেউ পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলছিল না। জাহাজে থাকলেও সমস্যা, আবার নেমে গেলেও সমস্যা হতে পারে। মাঝে একদিন শুনলাম “ভ্যাকুয়াম বোমা” ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা জানতাম ভ্যাকুয়াম বোমা পড়লে নিঃশ্বাস নিতে না পেরে দম বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়। এসব শুনে সবাই আরো ভয় পেয়ে যায়।

মার্চের ২ তারিখ, চারিদিকের এমন অনিশ্চিত ভীতিকর পরিবেশেও হালকা হেসে দুপুরের খাবার টেবিলে এক সহকর্মীকে থার্ড ইঞ্জিনয়ার হাদিসুর কেন যেন বলেছিল “আমার তো ভয় করছে না”! কে জানে তখন হয়ত অদৃষ্টও অলক্ষ্যে হেসেছিল।

সেদিন খাবারের পর ম্যানেজমেন্ট মিটিঙে সাতজন সিনিয়র অফিসার অংশ নেয়। দুইজন ক্যাপ্টেন (একজন ইনকামিং, একজন আউটগোয়িং), দুই জন চিফ ইঞ্জিনিয়ার (একজন ইনকামিং, একজন আউটগোয়িং), চিফ অফিসার, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সে মিটিঙে আমাদের জাহাজেই থাকার সিদ্ধান্ত হয়। কারণ অনেক চেষ্টা করেও বের হওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি। আবার সেই সাথে নিরাপদ পথের নিশ্চয়তাও ছিল না।

বিকেল ০৪:৪৫ মিনিট, নিত্যদিনের রেওয়াজ মেনে জাহাজে মুয়াজ্জিনের ভূমিকা পালন করা হাদিসুর আসরের নামাজের জন্য আজান দেয় পিএ সিস্টেমে। অন্যান্য যেকোন দিনের মতন এদিনও আজান দেবার পর নামাজ ঘরে হেঁটে যাবার সময় সে “সালাত সালাত” বলে সবাইকে নামাজে অংশ নেবার জন্য আহবান জানায়। ঐসময় ম্যানেজমেন্ট মিটিং চলতে থাকায় সিনিয়র অফিসারদের ছাড়াই ০৪:৫০ মিনিটে ‘এ ডেক’ এ (A Deck) জামাতে নামাজ হয়। মিটিং শেষ হবার আগেই নামাজ শেষ হয়ে যায়।

A ডেকের একটা কনফারেন্স রুমে নামাজ পড়া হত। B ডেকে রেটিংরা থাকত। C ডেকে থাকত অফিসাররা । D ডেকে ক্যাপ্টেন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার, সেকেন্ড অফিসার ও ফিমেল ক্যাডেটরা থাকত।

বিকেল ৫টা ১০ মিনিট। বাংলার সমৃদ্ধির ব্রিজ। ব্রিজের সামনে বাম দিকে (port side) এ্যডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার দাঁড়িয়ে। থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর বাম দিকের একটু পিছনে জাহাজের রেডিও কনসোলের সামনে। স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে ডিউটিরত ডেক ক্যাডেট। তার অদূরেই চিফ অফিসার (এ্যডিশনাল মাস্টার)।

হাদিসুর তখন  মোবাইল ফোনে ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। দেশে গেলে বিয়ে করবে, একটা ঘর তৈরী করছে, মায়ের অসুস্থতা এ ধরনের দৈনন্দিন পারিবারিক আলাপ। হাদিসুরের বাবা স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মা অসুস্থ। তিন চার দিন আগেই ফোনে মা’কে বলেছিল “মা তুমি ঠিকঠাক মতন খাওয়া দাওয়া না করলে আমি কিন্তু আর আসব না”। ছোট দুই ভাইকে ওই পড়াশোনা করাতো। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া মানুষটা এতই সহজ সরল যে ভালবেসে বন্ধুরা প্রায়ই বলত, তোকে দিয়ে কিছু হবে না।

ঠিক ঐ মুহূর্তে হাদিসুরের ১ মিটারের মধ্যে একটি মিসাইল জাহাজে আঘাত করে। ফোনের ওপাশে ওর ভাই শুধুই একটা বিকট শব্দ শুনতে পায়! তারপর ভয়ংকর নিরবতা। মিসাইল কম্পাস ডেকের মেইন মাস্টের বাম দিকে আঘাত করে ব্রিজ দিয়ে ঢুকে সাইড শেল ফুটো করে বেরিয়ে যায়। প্রবল তাপে রেলিং গলে যায়। VSat পোস্ট উড়ে গিয়ে নদীতে পড়ে। ব্রিজের সব কাঁচ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। রাডার ভেঙ্গে ছিটকে তিন নম্বর হ্যাচ কভারের উপর যেয়ে পড়ে।

সে সময় চিফ অফিসার (এ্যডিশনাল মাস্টার) চা খাচ্ছিলেন। চায়ের কাপ ভেঙ্গে যায়। ব্রিজের কাঁচ ভেঙ্গে ডেক ক্যাডেটের মুখে আঘাত করে। মিসাইল বিস্ফোরণের প্রবল ধাক্কায় ব্রিজের পোর্ট সাইডের দরজা দিয়ে ছিটকে পোর্ট উইঙে (Port Wing) বেরিয়ে আসে এ্যডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার। হতভম্ব হয়ে অল্প সময়ের জন্য তার স্মৃতিভ্রম হয়। এক মিনিটের মধ্যে ব্রিজ উইঙে বেরিয়ে আসে ডেক ক্যাডেট ও চিফ অফিসার। স্তম্ভিত ডেক ক্যাডেট থরথর করে কাঁপছে ও কাঁদছে। ভয়ে ওর কথা আটকে গেছে।  ততক্ষণে ব্রিজের সর্বত্র দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।   

ঠিক সে সময় জাহাজের কেউ একজন নামাজের শেষ সালাম ফিরাচ্ছিলেন। অন্য কেউ স্নান শেষে এক পা রুমে দিয়েছে আর এক পা তখনো বাথরুমে। বিকট শব্দের সাথে প্রবল ঝাঁকুনি অনুভব করে তারা। বিহ্বল চোখে দেখতে পায় উপর থেকে ঝরঝর করে আগুন আর কাঁচ পড়ছে।

ব্রিজের দরজা ভেঙ্গে ডি ডেকের উপর আছড়ে পড়ে। ডি ডেকের এ্যালিওয়েতে (alleyway) পড়া সেই দরজায় আগুন ধরে যায়। এ্যাকোমোডেশন (accommodation) আস্তে আস্তে ধোঁয়ার ভিতরে হারিয়ে যেতে থাকে। জাহাজে মিসাইল হামলা ও আগুন লাগার দুঃসংবাদ প্রায় সাথে সাথেই বি এস সি কে জানানো হয়।

আমাদের আগুন নেভানোর প্রশিক্ষণ ছিল। কিন্তু জাহাজে বোমা হামলা হলে কি করতে হবে সে প্রশিক্ষণতো আমাদের ছিল না। তাই এ বীভৎস আক্রমণের আকষ্মিকতায় আমরা ক্ষণিকের জন্য হতভম্ভ হয়ে যাই। তবে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে অতি অল্প সময়েই আমাদের দায়িত্ববোধ জেগে ওঠে। জাগ্রত হয় বেঁচে থাকার আদিম আকুতি। শুরু হয় লড়াই!

গত কিছুদিন ধরেই আমরা জরুরী অবস্থার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। এ কয়দিনে আমরা অনেকবার ফায়ার ড্রিল করেছি। সবার জানা ছিল এ অবস্থায় কি করতে হবে। দক্ষ হাতে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার ফায়ার পাম্প চালিয়ে দেয়। সবাই গরম পোষাক আর লাইফ জ্যাকেট পরে কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। আগুনের লেলিহান শিখার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সবাই বিভিন্ন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একদিকে দিনের আলো কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে আগুন তখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যে ডি ডেকের দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

পানির তাপমাত্রা তখন ২ ডিগ্রি। ফায়ার হোস (Fire Hose) ধরে রাখাই কঠিন। হাত অবশ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্ত জাহাজের সবাই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে তখনো আগুন নিয়ন্ত্রনে নেবার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ্যাডিশনাল মাস্টার, ফিটার, অয়েলার এবং ওএস (Ordinary Seaman) ছিল একদম সম্মুখসারিতে। ওরা সবার সামনে থেকে জান বাজি রেখে আগুনের সাথে যুঝতে থাকে। ইঞ্জিন রুমে লো ইনসুলেশন এ্যলার্ম আসতে থাকে। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জাহাজের প্রায় সব ইকুইপমেন্ট বন্ধ করে দেয়। অসম এই লড়াইয়ের এক পর্যায়ে প্রায় আড়াই ঘন্টা পর প্রলয়ংকরী আগুন আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে আসে।

হেড কাউন্ট করা হয়। ২৯ জনের মধ্যে ২৮ জনকে পাই আমরা। পাওয়া যাচ্ছিল না হাদিসুরকে। সারা জাহাজ জুড়ে ওকে খোঁজার সময় ভয় ও বিষাদের এক হিমশীতল শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে সবার মধ্যে। এর সাথে যুক্ত হয় আবারো বোমাবর্ষণের আতঙ্ক।

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মত দ্বিতীয় দফায় ব্রিজে আবার আগুন ধরে। এ সময় মেইন ফায়ার পাম্প চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ ফায়ার পাম্পের কন্ট্রোল সুইচ ব্রিজে ছিল। ওটা কাজ করছিল না। অন্য একটা পাম্প চালানো হয়। অনেক চেষ্টায় আধঘন্টা পর আমরা আগুন নিভাতে পারি। 

রাতের আঁধারে ব্রিজের ধ্বংসস্তুপের মাঝ দিয়ে ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় আমরা হাদিসুরকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ মানুষের মতন একটা আদল চোখে পড়ে। পা ভাঁজ করা অবস্থায় তাকে প্রথম দেখে ফিটার। পুরো শরীর পুড়ে গেছে। অয়েলার বলে ওঠে “থার্ড ইঞ্জিনিয়ার স্যার আর নাই”! হাদিসুরের দেহ ফলস সিলিং এর (false ceiling) নিচে চাপা পড়ে ছিল। হয়তো এত কাছে পড়া মিসাইলের প্রচন্ড শক ওয়েভে ও  অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। যার জন্য অন্য সবাই বের হয়ে আসতে পারলেও ও বের হতে পারেনি। হাদিসুরের নিথর দেহ চিফ অফিসার, ফিটার, অয়েলারসহ অন্যান্যরা মিলে অতি যত্নে ধরাধরি করে কোল্ড রুমে নিয়ে রাখে। এ মৃত্যুর খবর রাত আটটার দিকে অফিসকে জানানো হয়।

আশ্চর্যজনকভাবে জাহাজে মিসাইল পড়ার পর কেবিন থেকে বেরিয়েই আমরা দেখতে পাই জাহাজের দুই দিকে দুইটা স্থানীয় টাগবোট উপস্থিত! তার অল্প সময়ের মধ্যে চলে আসে আরো একটা টাগবোট। পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক রওনা না দিলে পূর্ণ গতিতে আসলেও মিসাইল পড়ার পর এত অল্প সময়ে টাগবোট আমাদের জাহাজের কাছে আসতে পারার কথা নয়। টাগবোট থেকে আমাদের বারবার বলা হচ্ছিল, “হারি আপ। কাম ডাউন।” (Hurry up. Come Down.)। চাইলে আমরা তখনই নেমে যেতে পারতাম। টাগবোটগুলো আমাদের জন্য মাঝরাত (সাড়ে বারোটা) পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কিন্তু বাঙালিরা নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত। অনুমতি না থাকায় এমন মৃত্যুপুরীতে থেকেও আমরা জাহাজ ত্যাগ করিনি।

এর মধ্যে জাহাজ ব্ল্যাক আউট হয়ে যায়। ইমারজেন্সি জেনারেটর চালানো হয়। রাতের বেলা আমরা ইঞ্জিন কন্ট্রোল রুমে ছিলাম। একোমডেশন পানিতে ভেসে গেছে। প্রায় সব রুমের ভেতর পানি। চিফ কুক কিছু শুকনা খাবার নিয়ে আসে। পাউরুটি, জেলি, খেজুর এসব খাই আমরা। রাতে ফায়ার পেট্রলের ব্যবস্থা করা হয়। বোধহীন, বিবশ এক নির্ঘুম রাত কাটে সবার ইঞ্জিন কন্ট্রোল রুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ঘুরেফিরে সবার মনে তখন একটাই ভাবনা। এই নিকষ কালো অন্ধকার রাত কেটে কখন ভোরের আলো ফুটবে। আদৌ ফুটবে তো?

একজন মৃত। ব্রিজ নষ্ট। এ্যাকোমোডেশন (accommodation) ভেসে গেছে। জাহাজের কমিউনিকেশন সিস্টেম পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে। লো ইনসুলেশনের কারণে জাহাজের ইলেক্ট্রিক্যাল সিস্টেম অকেজো। আরেকবার আগুন লাগলে সেটা নেভানোর মতোন আর কোন ব্যবস্থা ছিল না। এ অবস্থায় কারো মাথাও ঠিক মতো কাজ করছিল না। কেউ কেউ বলছিল, লাইফবোট নামিয়ে পোর্টে চলে যাই। সেক্ষেত্রে হয়ত পোর্ট পর্যন্ত যাওয়া যাবে। কিন্তু ওখানে যদি আমাদের ঢুকতে না দেয়, তাহলে কি হবে? যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটা দেশে কোন কিছুই নিয়ম মেনে চলে না। একেক জন একেক রকম কথা বলছিল। বিভ্রান্তি চারিদিকে। অফিস থেকে একবার বলা হচ্ছিল নেমে যাও। আবার অন্য কেউ বলছিল, “আমি বলছি, নামবে না”। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ক্যাপ্টেন জাহাজ ছাড়তে চাচ্ছিলেন না। আর তাই ওভাররাইডিং অথরিটি থাকা সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন কোনরকম সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। চরম এই অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ে ধৈর্য্যহীন হয়ে যেতে থাকে সবাই।

আমরা শুনতে পাই যে, রাশিয়া বিদেশিদের দেশ ত্যাগের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত আমাদের জানাচ্ছিলেন কিভাবে দেশ ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু আমাদের ছিল না শুধু, অনুমতি ।

পরদিন দেশবিদেশের মিডিয়ায় আমাদের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়। মিডিয়ার লোকজন আমাদের ফোন করে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করে। তখন দূর থেকে ধারণ করা একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে আমাদের জাহাজের উপর মিসাইল আঘাত করছে। ঐ ভিডিওতে ইউক্রেনীয় ভাষায় একটা কিছু বলতে শোনা যায়। আমরা পরে জানতে পারি, এটার মানে “ঠিক মতন পড়েছে”।

অনেক টানাপোড়নের পর সম্ভবত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে আমাদের জাহাজ ত্যাগের অনুমতি মেলে। মার্চের ৩ তারিখ স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে একটা টাগ বোট আসে পোর্টের হার্বার মাস্টারসহ। জাহাজ ত্যাগের আগে হাদিসুরের জানাজা পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পানিতে ভেসে যাওয়া জাহাজে তখন শুকনো জায়গা খুঁজে পাওয়াই ছিল দুস্কর। এ্যডিশনাল চিফ অফিসারের ইমামতিতে হাদিসুরের জানাজা পড়ানো হয় জাহাজের গ্যালিতে (galley)। দুর্ভাগা এই সহকর্মীর জন্য অন্তরের বিশুদ্ধতম সুষমা দিয়ে সবাই দোয়া করি পরম করুণাময়ের দরবারে।

ক্যাপ্টেনের নির্দেশে থার্ড অফিসার লাইফ বোটের রেশন সরিয়ে আনে। বাইরে থাকলে হয়ত এই খাবার আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে, এই আশায়। অতি প্রয়োজনীয় অল্প দুই-একটা জিনিস নিয়ে আমরা পাইলট ল্যাডার (pilot ladder) দিয়ে একে একে সবাই নেমে আসি। অতি যত্নে নামিয়ে আনা হয় হাদিসুরকেও। তখনো তার নিথর দেহ থেকে রক্তপাত হচ্ছিল। কারো কারো হাত ও পোষাক ওর রক্তে লাল হয়ে যায়। প্রবল বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় আমাদের চেতনা।

আমাদের সামনেই একটা তুর্কির জাহাজ, তার পাশে আরেকটা মালয়শিয়ান জাহাজ ছিল। টাগবোট দিয়ে পোর্টে যাবার সময় আমরা ঐসব জাহাজে কোন মানুষ দেখি নাই। নিকোলাই পোর্টে আরো দু’টো জাহাজ ছিল। ওদের নাবিকরাও জাহাজ ফেলে চলে গিয়েছিল।

হাদিসুরের দেহ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের নেয়া হয় বাঙ্কারে। সবার জন্য তিনটা রুম দেয়া হয়। ঐ বিল্ডিঙে রুম হিটার ছিল। তারপরেও ঠান্ডা লাগছিল। এখানে আমরা জাহাজ থেকে নিয়ে আসা খেজুর এবং পানি খাই। সাথে করে নিয়ে আসা ইমারশন স্যুট (immersion suit) গায়ে দিয়ে কেউ কেউ ঘুমানোর চেষ্টা করছিলো।

এ সময় দেবদূতের মতন আবির্ভূত হন, পোল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। আমাদের সাথে সাথে উনিও নির্ঘুম ছিলেন সারারাত। শারীরিকভাবে না থেকেও আমাদের সাথে ছিলেন সর্বক্ষণ। দিন-রাত যোগাযোগ রেখেছেন ক্যাপ্টেন এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে নিরাপদে ইউক্রেনের সীমান্ত পাড়ি দেবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত, সত্যিকারের অভিভাবকের মতন অতন্দ্র প্রহরী হয়ে।

৩ তারিখ সকালে একটা বাস আসে আমাদের নেবার জন্য। কিন্তু বাসে ওঠার সাথে সাথে আবার গোলাগুলি শুরু হয়। ফলে দ্রুত বাস থেকে নেমে বাঙ্কারে চলে আসি। ঐদিন কিছু খাবার কেনার জন্য আমরা বাইরে যাবার চেষ্টা করি। কিন্তু দোকানপাট সব বন্ধ ছিল। বাঙ্কারের স্টোর থেকে আমাদের কিছু গম দেয়া হয়। আমরা সেই গম সিদ্ধ করে খাই।

যাতে আমাদের অবস্থান কেউ জিপিএস (GPS) দিয়ে ট্র্যাক করতে না পারে তাই নিরাপত্তার খাতিরে ঐসময় সবার মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখি। চারিদিকে গুজব! দেশের পত্রিকায় ছাপা হয় যে আমরা মলদোভা পৌঁছে গেছি। যদিও আমরা তখন যুদ্ধক্ষেত্রের এক বাঙ্কারে আটকে আছি।

৩৯ ঘন্টা বাংকারে থেকে ৪ তারিখ সকালে আবারো অলভিয়া থেকে মলদোভার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই ২০ সিটের একটা বাসে করে। ২৮ জনের বাকি ৮ জন কোনমতে সিটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় বসে। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত আমাদের কথা দেন যে, যেকোন ভাবেই হোক উনি হাদিসুরের দেহ দেশে পাঠানোর বন্দোবস্ত করবেন।

মাইকোলেভ থেকে বের হবার জন্য দু’টো পথ। প্রথম পথের কাছাকাছি সেনা ঘাঁটি থাকার কারণে ঐ এলাকায় প্রায়ই বোমা হামলা হয়। দ্বিতীয় পথে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সেনারা মুখোমুখি অবস্থান করছে। আলোচনা করে আমরা প্রথম পথ দিয়ে মলদোভার দিকে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। পথে দেখতে পাচ্ছিলাম ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যেই বোমাবর্ষণ হচ্ছে। একটা ব্রিজ পর্যন্ত ওখানকার সবচেয়ে বিপদসঙ্গকুল পথ পাড়ি দেয়ার সময় আমাদের বাসের সামনে সাহায্যকারী একটা বেসামরিক গাড়ি ছিল। পথটুকু পার করে দিয়েই, ঐ গাড়িটি চলে যায়। এ সময় আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে পথিমধ্যে সমস্যা হলে একটা নির্দিষ্ট “সেইফ হোমে” (safe home) যেতে পারব।

ব্রিজ পার হয়ে আমরা একটা মহাসড়কে উঠি। বাংকার থেকে মলদোভা যাবার পথে আমাদের ২০টার মতো চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বাস থামিয়ে স্থানীয় সেনাবাহিনীর লোকজন জিজ্ঞেস করেছে আমরা কারা? দু-এক জায়গায় পাসপোর্ট দেখেছে। তবে বাংলার সমৃদ্ধি বা বাংলাদেশের নাবিক পরিচয় পাওয়ার পর কেউ আর কিছু বলেনি। হয়তো সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আগে থেকেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। মহাসড়কের দু’পাশ জুড়ে শুধু ভুট্টার ক্ষেত। একদম ফাঁকা জায়গা। এইদিক খুব একটা বোমাবর্ষণ হচ্ছিল না।

মাইকোলেভ থেকে ওডেসা ১৮০ কিমি। ওডেসা থেকে মলদোভা আরও ৮০ কিমি। মাইকোলেভ থেকে বাসে উঠেছিলাম সকাল ৮টায়। ওডেসায় পৌঁছাই বিকেল সাড়ে ৪ টায়। তখন তুষারপাত হচ্ছিল। প্রবল মানসিক চাপের সাথে শারীরিক ক্লান্তিতে আমরা দুর্বল হয়ে পরি। পুরো পথে আমরা বাংকার থেকে পাওয়া গম ভাজা, জাহাজ থেকে নিয়ে আসা লাইফবোটের বিস্কিট এবং পানি দিয়ে চালাচ্ছিলাম। অলভিয়া পোর্টের হার্বার মাস্টার আমাদের কিছু স্থানীয় অর্থ দিয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে ওডেসায় এসে একটা রেস্টুরেন্টে হাল্কা কিছু খাই। কারফিউ থাকায় ওডেসায় সন্ধ্যার পর গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ ছিল। তাই ওখান থেকে আমরা দ্রুত বের হয়ে যাই।

রাত দু’টোর দিকে আমরা মলদোভা সীমান্তে পৌঁছাই। ওখানে শত শত গাড়ির বিশাল লাইন। এ লাইন দ্রুত পেরুতেও পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হয়তো কিছু একটা করেছিলেন। ফলে, আমরা অসংখ্য গাড়ির সিরিয়ালের অনেক পেছনে থেকেও একদম সামনে চলে আসতে পারি। পুরো সময়জুড়েই মনে হয়েছে যে পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের সাথে ইউক্রেনের ভাল বোঝাপড়া ছিল। যার কারণে দীর্ঘ এই যাত্রাপথের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের জন্য কঠিন জিনিসগুলো অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। বেশ বোঝা গেছে সরকার আমাদের জন্য অবশ্যই বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিল।

ইউক্রেনের তিনজন সৈন্য এসে আমাদের নো-ম্যানস ল্যান্ডে (No man’s land) নিয়ে যায়। আমরা ওখানে কফি খাই। আর কিছু খাবার মতন ছিল না। ইউক্রেন-মলদোভা সীমান্তে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে তিন-চার ঘন্টা সময় লেগে যায়। সীমান্ত পার হবার আগে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের একটা ভিডিও ধারণ করে। সেখানে, ওদের স্থানীয় ভাষায় বলতে বলা হয় যে, “ইউক্রেনের জয় হোক”। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই ভিডিও ইউক্রেনের মিডিয়ায় চলে আসে। ক্যাপ্টেন অফিসকে জানিয়ে দেয় যে, নিরাপত্তার খাতিরে স্থানীয়দের কথায় আমাদের এটা বলতে হয়েছে।

বিএসসি এর জিএম এসপিডি, এম ডি ছাড়াও নৌ মন্ত্রনালয়ের সচিবের সাথে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমাদের জন্য মলদোভা সীমান্তে দু’টো বাস আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন। সেই বাসে করে আমরা রোমানিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। 

৫ তারিখ দুপুর দুইটার দিকে আমরা বুখারেস্টে আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে এসে পৌঁছাই। রোমানিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্যরা হোটেলে আমাদের গ্রহণ করেন। ওখানে স্থানীয় সাংবাদিকরাও ছিল। রাষ্ট্রদূতের বাসায় আমাদের রাতের খাবারের দাওয়াত ছিল। সেদিন উনার স্ত্রী নিজে আমাদের জন্য খাবার রান্না করেছিলেন। অন্য কোন পোষাক না থাকায় আমাদের অনেকেই বয়লার স্যুট (boiler suit) পরে উনার বাসায় গিয়েছিল।  আমাদের জানানো হয় যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের দেশে পাঠানোর বন্দোবস্ত হচ্ছে। অবশেষে বুখারেস্ট এয়ারপোর্ট থেকে ইস্তানবুল হয়ে ঢাকা। আমরা দেশে ফিরে আসি ৯ তারিখে। হাদিসুর আসে ১৩ তারিখ।

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ এখনো চলছে সে খবর তাবৎ বিশ্ব জানে। যা জানা নেই তা হল, আমাদের কেউ কেউ এখনো মানসিক বৈকল্যে ভুগছে। সহকর্মী হারানোর বেদনা, বিস্ফোরণের আতঙ্ক, আগুনের পোড়া গন্ধ, ধ্বংসের বিভীষিকা, জীবন-মৃত্যু সন্ধিক্ষণের অনিশ্চয়তা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় রোদেলা দুপুরে, সন্ধ্যের কমলা আলোয়, কালো রাতের গভীরে। নিদ টুটে যায় সময়-অসময়ে। তখন ধক্ করে বুকের গভীরে পাক দিয়ে ওঠে অব্যক্ত অনুভূতি। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে চেতন-অবচেতনে। 

থেকে থেকেই প্রশ্ন জাগে মনে, বাংলার সমৃদ্ধি কি অলভিয়াতে নাও যেতে পারত? চলেই যখন গেল, পরিস্থিতি বিচারে দ্রুত বের হয়ে আসা একেবারেই কি অসম্ভব ছিল?  নাবিকদের জন্য জাহাজ ত্যাগের অনুমতি কি আসতে পারতো ন্যুনতম সময়ক্ষেপণ না করে? তাতে করে হারিয়ে যাওয়া জীবনটি কি টিকে যেত? ফিরে আসা ২৮ নাবিকের মানসিক যাতনার যে প্রবল কশাঘাত, সেটা এড়ানোর কোন উপায় কি সত্যিই ছিল না? প্রাতিষ্ঠানিক পদাধিকারীগন আপন দর্পণে চেয়ে একবার কি ভাববেন ভবিষ্যতে অতীব জরুরী অবস্থার মুখোমুখি হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং তার ধরণ কেমন হবে অথবা হওয়া উচিৎ? ‘ওভাররাইডিং অথরিটি’ (overriding authority) – এর সঠিক এবং সময়োচিত প্রয়োগ যেন করা হয়, যেন করা যেতে পারে তার সার্বিক পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার।  

আজও, এ ঘটনার এতদিন পরেও যখনই কেউ জানতে পারে যে, আমরা বাংলার সমৃদ্ধিতে ছিলাম, সবাই বলে যে তারা আমাদের জন্য দোয়া করেছিল। জীবন কখনো থেমে যায় না। জীবন কখনোই থামে না। বাংলার সমৃদ্ধির প্রায় সব নাবিক জীবিকার প্রয়োজনে, জলের টানে আবারো সাগরে ফিরে গেছে। কেউ ভাবছে আর কখনোই সাগরমুখি হবে না। সবার কথা জানি। শুধু হাদিসুর… আমাদের সকলের প্রিয় হাদিসুর জীবন সীমানার ওপারে গিয়ে কি করছে, আমরা জানি না। জীবন বাজি রেখে আগুনের লেলিহান শিখাকে, পুনরায় মিসাইল আক্রমণের ভয়কে ভ্রুকুটি করে আপ্রাণ লড়েও উদ্ধার করতে পারিনি। ওকে নিয়ে ফিরতে পারিনি আমরা। তবে পরম করুণাময় নিশ্চয়ই হাদিসুরকে দেখে রেখেছেন। রেখেছেন আপন আলয়ে, সবচেয়ে সুন্দর বাগিচায়।

এ কে এম সাইফুল্লাহঃ বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ২৯তম ব্যাচের এক্স-ক্যাডেট।
Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest News

Categories